বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, চট্টগ্রামে আইনজীবী ভাইয়ের হত্যা সংঘটিত করে একটি হত্যার খেলা সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু বাংলার জনগণ তাদের এই ষড়যন্ত্রের জবাব ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে দিয়েছে।
শুক্রবার কুমিল্লা নগরীর টাউন হল মাঠে আয়োজিত কর্মী সম্মেলনে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
ডা. শফিকুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, “আমরা আমাদের জীবন দেব, কিন্তু দেশের এক ইঞ্চি মাটিও ছাড়ব না। আমাদের এই অঙ্গীকার।” তিনি আরও বলেন, “আমরা একটি সাম্যের, ভালোবাসার, অহিংস ঐক্যের বাংলাদেশ গঠন করতে চাই, যেখানে সব ধর্মের ও বর্ণের মানুষ একসাথে বসবাস করবেন। বাংলাদেশ আমাদের সকলের।”
তিনি এটি স্পষ্ট করেন যে, “আমরা বলেছি, আমাদের দেশে কোনো মেজরিটি এবং মাইনোরিটি নেই। যারা এখানে জন্মগ্রহণ করেছেন, তারা সবাই আমাদের দেশের গর্বিত নাগরিক। মাইনোরিটি শব্দটি ব্যবহার করে কিছু গোষ্ঠী দেশের বাইরে থেকে তাদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়।”
ভারতের কিছু অপসংবাদ পরিবেশক মিডিয়া যে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে, সে প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাদের হিন্দু ভাইয়েরা এর প্রতিবাদে মিছিল করে সবার সামনে প্রমাণ করেছেন যে, এ দেশ আমাদের সবার।” তিনি উল্লেখ করেন, “আমরা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ করি না, কিন্তু তারা আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য প্রচার করছে।”
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, “দেশের মানুষ এখন পূর্ণ স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করছে।” তিনি যেসব মুক্তিযোদ্ধা অকাতরে জীবন দিয়েছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে গুম, খুন এবং ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। বিডিআর বিদ্রোহের আড়ালে তারা পরিকল্পিতভাবে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর ৫৭ জন চৌকস অফিসারকে হত্যা করেছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দের হত্যার পেছনেও ষড়যন্ত্র কাজ করেছে। এই হত্যার আগ্রাসী পরিকল্পনা নিয়ে তারা নেমেছিল।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “জাতি ২০২৪ সালের গণহত্যা এবং অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করছে এবং আইনের মাধ্যমে এ বিচার নিশ্চিত করা উচিত।”
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “সংস্কার শেষে যৌক্তিক সময়ে নির্বাচন আয়োজন করা হবে। আমাদের দেশের মানুষের সেবা করতে হলে সবার সহযোগিতা লাগবে। এই দেশ নতুনভাবে গড়তে হবে, আর সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি মুক্ত সমাজ গঠন করতে সদর্থক পদক্ষেপ নিতে হবে।”
নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আমাদের ত্যাগের যাত্রা এখনও শেষ হয়নি। আরও অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হবে, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। যে জাতির নেতারা ঘুমিয়ে থাকে, সেই জাতি যেকোনো সময় বিপদের সম্মুখীন হতে পারে।”
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “যারা এদেশের নেতৃত্ব দিতে আসবেন, তাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাই, তারা যেন হাতে লাঠি বা বন্দুক নিয়ে মানুষকে শোষণ করার জন্য আসেন না। পায়ে ধরে মানুষের ভোট নেবেন এবং ক্ষমতায় যাওয়ার পর দাম্ভিকতা দেখিয়ে মানুষকে বুলেট দিয়ে হত্যা করবেন, এই মানসিকতা নিয়ে আর আসবেন না। দেশের মানুষ এ ধরনের শোষণ ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করেছে। নতুন করে এ ধরনের মানসিকতা লালন করবেন না। আমরা দেশ ও জাতির সেবা করতে চাই। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের কবুল করলে, দেশবাসী যেন আল্লাহর ভালোবাসার পাত্র হন।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা যারা দেশের জন্য রক্ত দিয়েছেন, তাদের রক্তের ঋণ শোধ করার সুযোগ যেন পাই।”
ডা. শফিকুর রহমান উল্লেখ করেন, “কুমিল্লাবাসী দুটির ন্যায্য দাবি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে এবং আমি কুমিল্লা বিভাগ ও কুমিল্লা বিমানবন্দর চালু বাস্তবায়ন দেখতে চাই।”
গণমাধ্যম কর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আপনারা এখন মুক্ত, যদি আমরা বা আমাদের সহকর্মীরা কোনো ভুল করি তাহলে সেটি জাতির সামনে তুলে ধরুন। গঠনমূলক সমালোচনা করুন, কারণ সমালোচনা না করলে আমরা আমাদের ভুল থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো না।”
শুক্রবার দীর্ঘ ১৯ বছর পর কুমিল্লায় জামায়াতে ইসলামীর কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই দিন নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে—কান্দিরপাড়, টমছম ব্রিজ রোড, ঝাউতলা রোড, জিলা স্কুল রোড, সার্কিট হাউজ রোড, প্রেস ক্লাব মোড়সহ— জনসমুদ্রের ভিড়ে মুখরিত হয়ে ওঠে নগরী। নেতাকর্মীদের স্লোগানে গুণগুণ করতে থাকে পুরো শহর। টাউন হল মাঠের পাশাপাশি নারী নেতাকর্মীদের জন্য আলাদা প্যান্ডেল কুমিল্লা কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে স্থাপন করা হয়।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও কুমিল্লা মহানগরের আমির কাজী দীন মোহাম্মদের সভাপতিত্বে এই সম্মেলনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের।
এছাড়া সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মাসুম, মাওলানা আব্দুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মুহাম্মদ আব্দুর রব, সাবেক চাকসু ভিপি ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার, কুমিল্লা মহানগরের নায়েবে আমির মু. মোছলেহ উদ্দিন এবং একেএম এমদাদুল হক মামুনসহ জামায়াত ও ছাত্র শিবিরের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

0 মন্তব্যসমূহ